মহাপ্রস্থানের পথে
মনের মানুষ মেলে না সংসারে, মানুষের মন তাই সঙ্গীহীন। আসলে আমরা সবাই একা মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন হয় বাইরের প্রয়োজনে— বন্ধুত্বের প্রয়োজন, সৃষ্টির প্রয়োজন, স্বার্থের প্রয়োজন। সেদিন কম্বল, ঝোলা, লোটা ও লাঠি নিয়ে যখন নিতান্ত একাকী হিমালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হ’লো, সঙ্গী পেলাম না বলে সেদিন। কারো উপর অভিমান করিনি, নিরাসক্ত নির্লিপ্ত মানুষ চললো নিরুদ্দেশ হয়ে৷
প্রথম বৈশাখের চিতা জ্বলচে চারিদিকে, সমগ্র আর্যাবর্ত জুড়ে চলছে সূর্যদেবের অভিশাপের অগ্নিবৃষ্টি, ধূ ধূ করছে চারিদিকের ফসল কাটা মাঠ, সারা আকাশ মেঘের তৃষ্ণায় খাঁ খাঁ করছে—এমন দিনে কাশী হয়ে ছুটলাম হরিদ্বারের দিকে। যখন আমরা স্থানু, সীমাবদ্ধ, গৃহগতপ্রাণ ; শহর- সভ্যভার জোয়াল কাঁধে নিম্নে চোখে ঠুলি বেঁধে ঘুরি, তখন বুঝি নে এর বাইরে আছে বৃহত্তর জগৎ, উদার জীবন, প্রতিদিনের লাভ-ক্ষতি, সঙ্কীর্ণ জীবনের তুচ্ছতা ক্ষুদ্রভার পিছনে আছে যে একটি পরম আহ্বান, একথা ভূলে যাই৷ চারিদিকে যেমন – জমে জঞ্জাল, তেমনি জোটে মানুষ ; কিন্তু যেদিন আসে পথের ডাক, যেদিন বাজে দূরের ব্যাকুল বাঁশি, সেদিন আমাদের গা ঝাড়া দিয়ে একা একাই ছুটে বেরুতে হয়। তখন আর অপেক্ষা নেই, পিছনে চাওয়া নেই।
পার হ’লে। ফয়জাবাদ, পার হ’লো লক্ষ্ণৌ, পিছনে রইল বেরিলী গাড়ি চললো ছুটে। আমার এই যাত্রার পথে কেনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না, আয়োজন ছিল না, এ যেমন বিশৃঙ্খলা তেমনি আকস্মিক। রাত্রি- শেষে লাক্সার অতিক্রম করে তখন হরিদ্বারে এসে পৌঁছলাম, তখন চেয়ে দেখি এ একেবারে নতুন রাজ্য ! শীতের হাওয়ায় সর্বশরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেচে, এমন ঠাণ্ডা যে হাত-পা জড়িয়ে যায়। গরম থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দ হলো, শরীরে এলো উৎসাহ, গতির চাঞ্চল্য। রাত্রি শেষের অন্ধকার, মাথার উপরে নক্ষত্র খচিত কালো আকাশ, আশে পাশে কৃষ্ণ- কায় প্রহরীর মতো পাহাড়ের সারি, মধুর শীতল বাতাস—এদেরই ভিতর দিয়ে পথ চিনে চিনে চললাম ধর্মশালার দিকে। ধর্মশালাই তীর্থযাত্রীর…
মহাপ্রস্থানের পথে
প্রবোধ কুমার সান্যাল
(আন্তর্জাতিক ও প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাপ্ত)
সিনেমাচিত্র – ১৯৫৯
তনু প্রকাশনী
৩/১, আজিমপুর, ঢাকা
প্রকাশ করেছেন : তনু প্রকাশণী
ঢাকা
ছেপেছেন : অবনিরঞ্জন মান্না
১২, ওয়ারী, ঢাকা
অষ্টদশ মুদ্রণ :
প্রচ্ছদ কল্পনা : শ্রীবিভূতি সেনগুপ্ত
মূল্য : বার টাকা মাত্র